কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের 'কালো তালিকা' বা গোপন নথিপত্র নিয়ে বিশ্বজুড়ে আবারও ঝড় উঠেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে প্রায় ৩০ লক্ষ পৃষ্ঠার নতুন নথি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (DOJ)। এই নথিপত্রগুলো বিশ্বের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং রাজপরিবারের সদস্যদের সাথে এপস্টাইনের সম্পর্কের গভীরতা নতুন করে উন্মোচন করেছে।
আজকের (৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) প্রধান খবর এবং সাম্প্রতিক ফাইলগুলো থেকে পাওয়া চাঞ্চল্যকর তথ্যের সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:
১. আজকের বড় খবর: ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েলকে জেরা
আজ সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, মার্কিন কংগ্রেসের 'ওভারসাইট কমিটি' এপস্টাইনের সহযোগী এবং বর্তমানে সাজাপ্রাপ্ত ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েলকে জেরা করতে যাচ্ছে। কারাগার থেকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে তাকে প্রশ্ন করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, ম্যাক্সওয়েল তার 'পঞ্চম সংশোধনী' (Fifth Amendment) অধিকার ব্যবহার করে অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। তবে এই জেরা এবং নতুন নথিপত্রগুলো ওয়াশিংটন থেকে লন্ডন পর্যন্ত রাজনৈতিক মহলে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
২. এফবিআই-এর তদন্ত ও বিতর্কিত উপসংহার
সদ্য প্রকাশিত নথি থেকে জানা গেছে যে, এফবিআই দীর্ঘ তদন্তের পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে—এপস্টাইন নিজে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ওপর যৌন নির্যাতন চালালেও, তিনি মূলত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য 'যৌন পাচারকারী চক্র' (Trafficking Ring) চালাচ্ছিলেন না। এফবিআই-এর দাবি, এপস্টাইন তার নিজের বিকৃত কামনার জন্যই এই নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন।
তবে সমালোচকরা এবং ভুক্তভোগীদের আইনজীবীরা এই দাবি মানতে নারাজ। তাদের মতে, নতুন নথিতেই ইঙ্গিত রয়েছে যে হার্ভে ওয়াইনস্টাইনসহ অন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছেও ভুক্তভোগীদের পাঠানো হয়েছিল। এফবিআই কেন তদন্তটি আগেই বন্ধ করে দিয়েছিল, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে।
৩. বিশ্বনেতা ও প্রভাবশালীদের নাম আবারও শিরোনামে
নতুন ফাইলে বেশ কয়েকজন হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির নাম এবং তাদের সাথে এপস্টাইনের যোগাযোগের বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে:
-
প্রিন্স অ্যান্ড্রু: নথিপত্রে ব্রিটিশ রাজপরিবারের এই সদস্যের নাম শতবার উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন তথ্য প্রকাশের পর ব্রিটেনে তীব্র জনরোষ তৈরি হয়েছে। খবর অনুযায়ী, রাজকীয় বাসভবন থেকে তাকে সরে যেতে হয়েছে এবং রাজা চার্লস তার ভাইয়ের খেতাব ও সুযোগ-সুবিধা আরও সীমিত করার প্রক্রিয়ায় আছেন।
-
পিটার ম্যান্ডেলসন ও ব্রিটিশ রাজনীতি: যুক্তরাজ্যের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমারের সরকার বড় ধরণের চাপের মুখে পড়েছে। এপস্টাইনের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।
-
ডোনাল্ড ট্রাম্প: প্রকাশিত নথিতে ট্রাম্পের বিষয়ে এফবিআই-এর কাছে আসা বেশ কিছু অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। তবে বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এর অনেক অভিযোগই যাচাই করা সম্ভব হয়নি বা ভিত্তিহীন বলে মনে করা হয়েছে। ট্রাম্প বরাবরই এপস্টাইনের অপরাধের সাথে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করে আসছেন।
-
ইলন মাস্ক: নথিপত্রে দেখা গেছে, টেক বিলিওনিয়ার ইলন মাস্কের সাথে এপস্টাইনের ইমেইল আদান-প্রদান হয়েছিল এবং মাস্ককে এপস্টাইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। মাস্ক দাবি করেছেন তিনি সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তবে তাদের যোগাযোগ আগের ধারণার চেয়ে বেশি ছিল বলে নথিতে ইঙ্গিত মিলেছে।
৪. গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও রেড্যাকশন বিভ্রাট
ফাইলগুলো প্রকাশের সময় কর্তৃপক্ষের একটি বড় ভুলও ধরা পড়েছে। নথিপত্রের কিছু অংশ কালো কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়ার কথা থাকলেও (Redaction), কারিগরি ত্রুটির কারণে অনেক ভুক্তভোগীর নাম ও পরিচয় প্রকাশ হয়ে গেছে। এটি ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে।
উপসংহার
জেফরি এপস্টাইন ২০১৯ সালে কারাগারে মারা গেলেও, তার রেখে যাওয়া কেলেঙ্কারি এখনো বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের এই নতুন ফাইল প্রকাশ প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে থাকা অনেক সত্য এখনও পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। আজকের ম্যাক্সওয়েলের জেরার দিকে তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব, যদিও ন্যায়বিচারের পথ এখনও অনেক দীর্ঘ।